ইতিবাচক দেখছেন ব্যবসায়ীরা

বিশেষ প্রতিবেদক : ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এই জন্য বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। আর এটাকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ বাড়বে। সেই সঙ্গে সহযোগিতাও বাড়বে। এবার যে সব চুক্তি হয়েছে এরমধ্যে জ্বালানি-বিদ্যুৎ ছাড়াও সরঞ্জাম, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগের চুক্তিও হয়েছে। ভারতীয় দূতাবাস তাদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য উল্লেখ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের শেষ দিনে এই সব চুক্তি স্বাক্ষর হয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসায়ী ভারতে যান। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার সঙ্গে যেসব ব্যবসায়ীরা আসতে চেয়েছেন আমি না করিনি। আপনারা এবার চুক্তি করে নেন। সমঝোতা করেন। প্রধানমন্ত্রী ভারতের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানান। ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন চুক্তি বিনিময় হয়। দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চুক্তি কেবল হলেই হবে না। এই সব চুক্তির বাস্তবায়ন ও কার্যকর করাই হবে মুল বিষয়।
এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক আলহাজ্ব মো: হারুন-উর-রশিদ বলেন, ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে এটা ইতিবাচক দিক। তবে তারা বিনিয়োগের সময়ে তাদের স্বার্থটাকেই বড় করে দেখে। এই কারণে তারা জ্বালানি-বিদ্যুৎ ছাড়াও সরঞ্জাম, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। সেই হিসাবে করবে। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের খুব বেশি ব্যবসা হবে না। কারণ দুই দেশেই চায় দুই দেশে রপ্তানি করতে। কিন্তু সেটাতে আগ্রহ কম। এই কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বেশি। আমাদের পণ্য বেশি পরিমাণে ভারতে রপ্তানি করতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু সেটা হচ্ছে না কাঙ্খিতভাবে। তবে তারপরও বলবো ভারতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখেই বাণিজ্য ও ব্যবসা বাড়াতে হবে।
ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী। সেই হিসাবে এবারও তারা বিদ্যুৎ খাতকেই প্রধান্য দিয়েছেন। আর এবার যে সব বিষয়ে চুক্তি হয়েছে ও তারা বিনিয়োগ করবেন এরমধ্যে রয়েছে, রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র,নেপাল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার চুক্তি সহ মোট পাঁচটি বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প। ভারতের ব্যবসায়ীরা যে সব খাতে বিনিয়োগ করবেন এরমধ্যে চারটি বিনিয়োগ প্রকল্প তেল, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম খাতে সহযোগিতার চুক্তিও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা, ব্যবসায় স্বল্প ব্যয় ও ব্যাপক ভোক্তা ভিত্তির পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে ধরেন। সেই সুবিধা নিয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তিনি তাদেরকে মংলা, ভেড়ামারা ও মিরসরাইয়ে স্থাপিত বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকায় ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।  তার আহ্বানে ভারতের ব্যবসায়ীরা সারা দিয়ে এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি আগে থেকেই রয়েছে। এবার তাতে নতুন মাত্রা যোগ হলো। গত কয়েক বছর ধরে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫-১৬ (জুলাই-জুন) অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৪৫২.৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৫ বছরে (আর্থিক বছর ২০১১-২০১২ থেকে ২০১৫-১৬) দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্য ১৭%-এরও  বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামীতে তা আরও বাড়বে বলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা আশাবাদী।
এসএএফটিএ, এসএপিটিএ এবং এপিটিএ-এর অধীনে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট শুল্ক ছাড় দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু, অন্যান্য জিনিসের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা হ্রাসে ২০১১ সাল থেকে ভারতের না-তালিকা  থেকে ২৫টি পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের ওপর সব ধরণের শুল্করেখাও পরিহার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী সম্প্রদায়গুলোর সুবিধার জন্য চারটি সীমান্ত-ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মধ্যে ত্রিপুরায় দুইটি এবং  মেঘালয়ে দুইটি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে আরো কিছু সীমান্ত ফাঁড়ির প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে এবং এগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বাংলাদেশকে ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতা করছে। জানুয়ারি ২০১০-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে ভারত বাংলাদেশের জন্য এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার লাইন অফ ক্রেডিট  ঘোষণা করে। প্রথম এলওসি-এরআওতায় এই প্রজেক্টগুলোর প্রায় সব সম্পন্ন হয়েছে । ২০১৫-এর জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার বাংলাদেশ সফরকালে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন আরেকটি এলওসি   ঘোষণা দেন। নতুন এলওসি সড়ক,  রেলওয়ে, বিদ্যুৎ,  নৌ, এসইজেড, স্বাস্থ্য ও  মেডিকেল  সেবা এবং কারিগরী শিক্ষার  ক্ষেত্রে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি  ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিদ্যমান ছিল এর আগে থেকেই। সেখানে ২০১০ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যুৎ  ক্ষেত্রে সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে দুইটি আন্তঃসংযোগ-এর মাধ্যমে ভারত  থেকে বাংলাদেশে ৬০০  মেগাওয়াট বিদ্যুৎ স্থানান্তর হয়। সম্প্রতি বহরমপুর-ভেড়ামারা আন্তঃসংযোগ দিয়ে ৫০০  মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং আরেকটি ১০০  মেগাওয়াট বিদ্যুৎ স্থানান্তরিত হয় সুরজমনিনগর (আগরতলা)-কুমিল্লা আন্তঃসংযোগ দিয়ে। ২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে বহরমপুর-ভেড়ামারা আন্তঃসংযোগ দিয়ে অতিরিক্ত আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রদানে সম্মত হন। ২০১৬ সালের মার্চে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরায়  ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানি এবং ত্রিপুরা  থেকে কুমিল্লায় বিদ্যুৎরপ্তানির উদ্বোধন করেন। রামপালে ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন(এনটিপিসি) এবং বাংলাদেশ পাওয়ার  ডেভলপমেন্ট বোর্ড(বিপিডিবি)-এর ৫০:৫০ যৌথ উদ্যোগে একটি ১৩২০ মেগাওয়াট জ্বালানি কয়লা মৈত্রী থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এর কাজ চলছে। ভারতের অনেক বেসরকারি কোম্পানি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের প্রতি বেশ উৎসাহী। গত দুইবছর যাবৎ ভারত বাংলাদেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে  বেড়েছে। ইন্ডিয়ান ওয়েল কর্পোরেশন, নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড, গ্যাস অথোরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড,  পেট্রোনেট এলএনজি লিমিটেড-এর মত অনেক সরকারি ইউনিটগুলো তাদের বাংলাদেশি  তেল ও গ্যাস খাতের অনুরুপ ইউনিটগুলোর সাথে কাজ করছে। অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের সাথে ৫০-৫০ সহযোগিতায় ওএনজিসি বিদেশ লিমিটেড এসএস-০৪ এবং এসএস-০৯ নামে বাংলাদেশে দুইটি অগভীর জলের ব্লক পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে এই ব্লক গুলোতে পরীক্ষামূলক কাজে নিয়োজিত আছে।
উল্লেখ্য, যদিও শেখ হাসিনার এবার ভারত সফরের দ্বিতীয় দিনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছিল, এবার ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগে চুক্তি করবে। কিন্তু পরে তা আবার বেড়েছে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এবার ভারতে গেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এদের সংখ্যা ছিল আড়াই’শ এর মতো। ওই প্রতিনিধি দলে ব্যবসায়ীদের নেতৃত্ব দেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমেদ। ভারতীয় ১৫০ ব্যবসায়ীও এ সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে ভারতের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাণিজ্য ও ব্যবসায়ীক চুক্তি বিনিময় হয়।

Leave a Reply