ঈদকে সামনে রেখে ফরিদপুরে মসলিন জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা ॥ভয়েস অব ফরিদপুর

সাখাওয়াত হোসেন সহিদ ॥ ভয়েস অব ফরিদপুর ॥
বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান দখল করে আছে ঐতিহ্যবাহী মসলিন জামদানি শাড়ীর নামটি। রেশমি সুতা থেকে তৈরি মসলিন জামদানির তাঁত গত বেশ কয়েক বছর ধরে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নে সোতাসী, মজুরদিয়া গ্রামে কাজ শুরু করেছে।
কোন প্রকার সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোগতারা তাঁত বসিয়ে মসলিন জামদানি তৈরি করতে শুরু করেছে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এই কারিগরদের ব্যস্থতা বেড়েই চলেছে। দিন রাত চলছে এ জামদানির তৈরীর কাজ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথে জামদানি ঘরে শুরু হয় হাক-ডাক। আসছে উৎসবকে সমানে রেখে নিস্তদ্ধতা ভেঙ্গে জেগে উঠে জামদানী পাড়ার কারিগররা। নিজস্ব তাঁতে বোনা প্রতিটি জামদানি শাড়ী ভাজে ভাজে নতুনের গন্ধ। দেশীয় পণ্যে নিত্য নতুন গবেষনা আর ক্রেতাদের চাহিদায় অনেক জনপ্রিয় এই বেনারশি জামদানী শাড়ী।
তবে বর্তমান বাজারে সূতাসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, কারিগর আর মেশিনারী সমস্যাসহ নানা বিষয় নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তাঁত শিল্পীদের ।
জেলার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নে গত ৭/৮ বছর আগে সোতাশী ও পাশ্ববর্তী মজুরদিয়া গ্রামের কয়েকজন কিশোর বেঁচে থাকার তাগিদে কর্মের সন্ধানে নারায়নগঞ্জ জেলার জামদানি পল্লীতে কাজ নেয়। সেখানে বছর দুই ধরে কাজও করেন তারা। সেখানে প্রথমে সামান্য বেতনে কাজ করতে থাকে, কাজ শিখার পর ৪/৫ হাজার টাকা উপার্জন শুরু করে। এই টাকা দিয়ে তারা নিজেদের এবং বাড়ীর সংসার কোনোমতো চালাতে থাকে। সেই থেকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিজেরা তাঁত স্থাপনের মাধ্যমে অধিক উপার্জনের। সে অনুযায়ী কেউ কেউ বাড়ী ভাড়া নিয়ে নারায়নগঞ্জ এর জামদানি পল্লীতেই তাঁত বসানোর চেষ্টা করলে বাঁধ সাধেন অন্যান্য তাঁত মালিকরা।
এতে অনেকের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলেও হাল ছাড়েননি জেলার বোয়ালমারীর মোঃ আবু নাছের (১৯) ও তৌহিদ বিশ্বাসরা। ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। লালিত স্বপ্ন প্রতিষ্ঠায় মনোবল আর জিদকে কাজে লাগিয়ে একটি তাঁত স্থাপন করে মসলিন জামদানি শাড়ী তৈরির কাজ শুরু করেন তৌহিদ বিশ্বাস। নিজের ভাই ইউসুফ বিশ্বাসসহ কয়েক জনকে শিক্ষা দেয় তাঁত চালানোর। এরই মধ্যে পাচটি তাঁত স্থাপন করেছেন তিনি।
একইভাবে ওই গ্রামের আবু নাছের ও স্ত্রী আল্লাদী বেগম ও তার ভাইকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আটটি তাঁত স্থাপনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছেন। যার প্রতিটি তাঁত থেকে দুজন কারিগরের মাধ্যমে মাসে পাঁচটি মসলিন জামদানি শাড়ী উৎপাদন করে।
আবু নাছের জানান, প্রত্যেকটি শাড়ীর মুল্য সর্বনি¤œ তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বিক্রয় করা হয়। প্রত্যেকটি শাড়ীতে ৬ থেকে ৮শ কোনটায় ১৫শ থেকে ২০ হাজার টাকার সুতা প্রয়োজন হয়। শাড়ীর ওজন হয় দুই থেকে আড়াইশ গ্রাম।
একইভাবে উপজেলার মজুরদিয়া এলাকার আলী আকবর জানান, গত ৪/৫ বছর হলো বাড়ীতে একটি টিনের ঘর তুলে ৬টি তাত বসিয়েছি। প্রতিটি তাত থেকে ৪ থেকে ৫ দিনে একটি শাড়ী তৈরী করা যায়। তিনি জানান, বর্তমান বাজারে সূতাসহ বিভিন্ন উপকরণের দামবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, কারিগর আর মেশিনারী সমস্যাসহ নানা বিষয়ে সমস্যা রয়েছে তাঁত শিল্পর সাথে জড়িতদের।
উদ্যোগতারা জানান, নারায়নগঞ্জ থেকে প্রতি ভরি সুতা ৬০ থেকে ৮৫ টাকায় ক্রয় করতে হয়। খরচ খরচা বাদে বিক্রিত শাড়ীর লাভের টাকার অর্ধেক কারিগরের বাকি অর্ধেক থেকে হেলপারের বেতন দিয়ে যা থাকে তা মালিকের। কারিগরদের অনেকেই শিশু শ্রেনীর হলেও স্কুলে লেখাপড়ার পাশাপাশি স্ব-উৎসাহেই স্কুল সময়ের আগে পরে কাজ করে থাকে। ক্ষুদে কারিগর জিহাদ বিশ্বাস (১০), হৃদয় (১৪), জাহিদ (১০), আরশাদ (০৮), সাগর বিশ্বাস (১০) ও দ্বীন ইসলামের (১২) সাথে কথা হয়। তারা জানায়, কাজ করতে ভালোই লাগে। উপার্জিত অর্থ লেখাপড়া সহ সংসারের কাজে লাগাবে বলেও জানায় তারা।
উদ্যোগতা তৌহিদ বিশ্বাস জানান, উৎপাদিত শাড়ী বিদেশে চলে যায়। আমরা নারায়নগঞ্জের ফড়িয়াদের কাছে তাদের নির্ধারিত মুল্যেই বিক্রি করতে হয়। তিনি দাবী করেন, এ শাড়ীর স্থানীয় বাজার সৃষ্টি করা গেলে অনেকেই এ পেশায় আসবে।
তৌহিদ বিশ্বাস আরো জানান, এ ব্যবসা পরিচালনা করতে তাদের বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে চড়া সুদে ঋন করতে হয়েছে। ফলে পেশাটি লাভজনক হলেও তাদের (উদ্যোগতাদের) লাভের মুখ দেখতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। উদ্যোগতারা এ শিল্পের প্রসারে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার জন্য সরকারের উদ্ধর্তন কর্মকতাদের প্রতি আহবান জানান।
স্থানীয় সাতৈর ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান জানান, ফরিদপুরে তাঁত শিল্প কারিগরদের হাতে তৈরী বেনারশি জামদানির চাহিদা বেশ রয়েছে। তবে সময়মত কারিগর ও অর্থের অভাবে এই শিল্পর সঙ্গে জড়িতরা অন্য পেশায় যাচ্ছে। তার দাবি, প্রয়োজনীয় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দিলে এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

Leave a Reply