নতুন স্বপ্ন দেখার দিন আজ

এম নজরুল ইসলাম
আজ ১০ জানুয়ারি। বাঙালী জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের এই দিনে দেশে, প্রিয় মানুষের কাছে ফিরে আসেন বাঙালী জাতির জনক, বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস তাঁকে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তাঁর নামে পরিচালিত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। কারাগারে থেকেও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক তিনি। গ্রেফতার হওয়ার আগেই দিয়ে যান প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল ধারার প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভেতর দিয়ে চূর্ণ হয়ে যায় এ উপমহাদেশের যুগ-যুগান্তরের চিন্তার অস্থিরতা ও মানসিক অচলায়তন। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষ ফিরে পায় সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা। বাঙালীর আশা ও আকাক্সক্ষার প্রতীক বঙ্গবন্ধু নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অন্ধকারের শক্তির সর্বনাশের সূচনাও তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভেতর দিয়ে।
এ দেশের মানুষ দীর্ঘকাল থেকেই লড়াই করেছে স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা ছিল বাঙালীর দীর্ঘকালের স্বপ্ন। সেই অগ্নিযুগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। সেই বীর শহীদদের রক্তের মিলিত স্রোতধারাই স্বাধীন বাংলাদেশের রূপায়ণে মিলিত শক্তি হয়ে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই মহান পথপ্রদর্শক, যিনি জাতিকে একটি অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাঁর সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্বে জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে। স্বাধীনতার ডাক তিনি দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ এসব অবিস্মরণীয় ও অমোঘ বাক্যের ভেতর দিয়ে বাঙালী দেখতে পায় তার আগামী দিনের দিশা। এরপর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে তিনি ঘোষণা করেন স্বাধীনতা।
স্বপ্ন ছিল তাঁর একটি স্বাধীন দেশের। স্বপ্ন ছিল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের। স্বপ্ন ছিল এদেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার। সেই স্বপ্ন নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে পা রাখা মানুষটি কি ভাবতে পেরেছিলেন, নয়টি মাসের যুদ্ধে কী তা-ব চালিয়ে গেছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা? ভাবতে পারেননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মানুষের তখন খাদ্যের নিরাপত্তা নেই। অনেকেরই আশ্রয় নেই। কিন্তু বিশ্বাস ছিল অটুট। মানুষ বিশ্বাস করেছিল তিনি ফিরলে আবার ঘুরে দাঁড়াবে এই দেশ। তাঁর জাদুকরি সাংগঠনিক শক্তিতে তিনি আবার নতুন করে এই দেশটিকে গড়ে নিতে পারবেন। পারবেন সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে। এই এক অসাধারণ গুণ ছিল তাঁর। মানুষের মনে বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারতেন। মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করেছিল। তাঁর ওপর নির্ভর করেছিল। তিনি বাঙালীকে একটি স্বাধীন ভূখ-, স্বাধীন সত্তা ও জাতিসত্তার পরিচয় এনে দিয়ে সেই বিশ্বাসের মূল্য দিয়েছিলেন। মানুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিল সেই স্বপ্ন পূরণের আশা নিয়েই উপস্থিত হয়েছিল ঢাকার বিমানবন্দরে। বিমানটি বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করার মুহূর্তে উচ্চারিত হয়েছিল ‘জয় বাংলা’ গ্লোগান। সেই গ্লোগান ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাংলার মানুষ জেনেছিল তারা আর অভিভাবকহীন নয়। তাদের অভিভাবক এসেছেন। মুক্ত মানুষ হিসেবে তিনি বাংলার মানুষের দুঃখ ভাগ করে নিতে তাদের মাঝেই ফিরে এসেছেন।
প্রিয় নেতাকে দেখতে কত মানুষ সেদিন একত্রিত হয়েছিল ঢাকায়? সংখ্যা গুণে হিসাব করা যাবে না। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্সের ময়দানে পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টার বেশি। ঘরে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী। প্রিয় সন্তানদের সঙ্গে অপেক্ষায় বাবা ও মা। কিন্তু তিনি নিজের বাড়িতে না গিয়ে গেলেন রেসকোর্সে। কেন? উত্তর খুবই সহজ। যে মানুষটির স্বপ্নজুড়ে কেবলই দেশের মানুষ, তিনি মানুষের কাছেই সবার আগে পৌঁছে যেতে চান। তাঁর কাছে দেশের মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না কোনদিন। তাই দেশের মাটিতে পা রেখে তিনি প্রথম তাঁর প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যই পেতে চেয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন স্টেটসম্যানশিপ কাকে বলে! রেসকোর্সে সংক্ষিপ্ত একটি ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। প্রাণের আবেগমাখা সেই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, আপনাদের ভাই হিসেবে বলছি, যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ মানবদরদী এক মহান নেতার কী দূরদর্শিতা! ঐ ভাষণে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বক্তৃতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘গত ৭ মার্চ আমি এই রেসকোর্সে বলেছিলাম, দুর্গ গড়ে তোলো। আজ আবার বলছি, আপনারা একতা বজায় রাখুন।’ তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব। বাংলাদেশ আজ মুক্ত-স্বাধীন। একজন বাঙালী বেঁচে থাকতেও এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন দেশরূপেই বেঁচে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে এমন শক্তি কারও নেই।’ সবাইকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্ববাসীকে আমরা দেখাতে চাই বাঙালীরা কেবল স্বাধীনতার জন্যই আত্মত্যাগ করতে পারে তাই না, তারা শান্তিতেও বাস করতে পারে।’ স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রথম ভাষণে বঙ্গবন্ধু একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা উচ্চারণ করেছিলেন। বলেছিলেন শান্তির এক বাংলাদেশের কথা। অর্থাৎ আবারও সেই শান্তির স্বপ্ন মানুষের মনে ছড়িয়ে দেয়া। মূলত বঙ্গবন্ধু সেই নেতা, যিনি প্রত্যেক বাঙালীর চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন এঁকে দিতে পেরেছিলেন। এই স্বপ্ন-সাধ ছিল তাঁরও। আর সে কারণেই দেশে ফিরে আসার পর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ভাষণে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, লক্ষ মানুষের প্রাণদানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ দেশে পা রাখার সেই দিনটিতেই দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্যেই সত্যিকারের স্বাধীনতা।
বাংলাদেশকে জীবন দিয়ে ভালোবেসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফিরে আসার পর রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে তিনি আরও বলেন, ‘ইয়াহিয়া খান আমার ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন। আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। বাঙালীরা একবারই মরতে জানে। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। তাদের আরও বলেছি তোমরা মারলে ক্ষতি নেই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।’ এই বাক্যটির ভেতর দিয়েই দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অসীম মমতা প্রকাশ পায়। দূরদর্শী এ জননায়ক সেই ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন জনসভায়। তাঁর ভাষণে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসে বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এ দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। তারা আমার মানুষকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্ব এসব ঘটনার সামান্য কিছুমাত্র জানে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বর্বর পাকবাহিনীর কার্যকলাপের সুষ্ঠু তদন্ত করার জন্য আবেদন জানাচ্ছি।’
পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেও এ দেশের কিছু মানুষের চক্রান্তে শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই জীবন দিতে হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদের এই মহান নেতাকে। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর নীতি ও আদর্শ রয়ে গেছে। সেই আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি। গড়ে তুলতে পারি তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই এগিয়ে যাচ্ছেন।

আজ ১০ জানুয়ারির এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবই।
লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

Leave a Reply