ফরিদপুর থেকেই শুরু হলো পাটের নতুন জাতের যাত্রা ॥ পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্যে

পান্না বালা/মাহ্বুব পিয়াল ঃ
বৃহত্তর ফরিদপুরের কৃতি সন্তান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম ২০১০ ও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনষ্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী নিয়ে তোষা ও দেশী পাটের জিন সিকোয়েন্সিং বা জীবন রহস্য উম্মোচন করেন। মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে পাটের নতুন এই জাত উদ্ভাবনের কাজ শুরু হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে মাকসুদুল আলমের মৃত্যুর পর পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বর্তমান মহাপরিচালক মনজুরুল আলমের নেতৃত্বে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ চলতে থাকে। সংস্থাটি নিজেস্ব গবেষণা কেন্দ্রে ২ বছর পরীক্ষার পর এই বছর সারা দেশের মধ্যে শুধু মাত্র ফরিদপুরের তালমায় রবি-১ পাটের পরীক্ষামূলক চাষ করেন এবং সফল ভাবে তা সম্পন্ন হয়। পাটের জীবন রহস্য উম্মোচনের সাত বছরের মাথায় এই সাফল্যের প্রথম বাস্তব প্রয়োগ ঘটল। এর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে পাটের নতুন যাত্রা শুরু হল পাটের জন্য বিখ্যাত ফরিদপুর জেলা থেকেই।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মানিকনগর গ্রাম। দিগন্ত জোড়া পাট ক্ষেত। দেখে মনে হয় সবুজের গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝে বাতাস বয়ে যাওয়ায় হেলে দুলে ওঠে পাট পাতা ও গাছগুলো। যেন ঢেউ খেলে যায় সবুজ গালিচায়। এই মানিকনগর গ্রামেরই একজন কৃষক লক্ষ্মণ সেন। তিনি পাট চাষ করেন। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পশ্চিম পাশে তাঁর বাড়ি। বাড়ির পাশেই জমি। সে জমিতে এবারও পাট চাষ করেছেন তিনি।
পাশাপাশি কয়েক টুকরো জমিতে পাট রোপন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু জমিতে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের তত্ত্ববধানে সদ্য উদ্ভাবিত রবি-১ পাট রোপন করা হয়েছে সারিবদ্ধ ভাবে। পাশের আরেক জমিতে লক্ষ্মণ সেন রোপন করেছে রবি-১ পাট, তবে সনাতনী পদ্ধতিতে বিজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে । এর পাশে ওই গ্রামের আরেক কৃষক মিলন খান তিনি রোপন করেছেন ভারতীয় জেআরও জাতের পাট। পাশাপাশি তিনি দেশী তোষা পাটের বীজ রোপন করেছেন আরেকটি জমিতে।
গত ১৩ জুলাই সরেজমিনে মানিকনগর গ্রামে পাশাপাশি রোপন করা বিভিন্ন পাটের ফলন, বৃদ্ধি ও উৎকর্ষতা যাচাই করতে চোখে পড়লো বেশ পার্থক্য।
দেখা গেছে দেশী তোষা ও ভারতীয় জাতের পাটের গাছের তুলনায় রবি-১ পাট গাছগুলি বেশী সতেজ এবং তাজা। রবি-১ পাট গাছগুলি গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত মোটামুটি ভাবে একই প্রস্ত বিশিষ্ট, কিন্তু অন্য দুই জাতের গাছগুলির কান্ড মোটা হলেও আগা ও গোড়ার দিকে চিকন।
লক্ষ্মণ সেন জানায়, আমাকে দিয়ে পরীক্ষামূলক ভাবে রবি-১ জাতের পাট চাষ করিয়েছে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। আপাতত দৃষ্টিতে এ বিজের গাছগুলি তরতাজা বেশি দেখা যাচ্ছে তবে সাফল্য নির্ভর করছে কি পরিমান আশ পাওয়া যায় তার উপর।
ফরিদপুর পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট সুত্রে জানা গেছে, ‘বেসিক এন্ড এ্যপালাইড রিসার্স অন জুট প্রজেক্ট’-প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানী উদ্ভাবিত রবি-১ জাতের এ পাট শুধুমাত্র ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মানিকনগর ও চৌশালা গ্রামের তিন কৃষকের মাধ্যমে চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে মানিকনগরের কৃষক লক্ষ্মণ সেনের ৪৮ শতাংশ এবং চৌশালা গ্রামের ছেকেন শেখের ৩৬ ও একই গ্রামের নইমুদ্দিনের ৩০ শতাংশসহ মোট এক একর ১৪ শতাংশ জমিতে এ পাট রোপন করা হয়েছে।
সরেজমিনে চৌশারা গ্রামের ছেকেন শেখের জমিতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে পাট কাটা হচ্ছে। একই গ্রামের নইমুদ্দিনকে দেখা গেল পাট জাগ দেওয়ার পর আশ রাস্তার পাশে বাশ দিয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন শুকানোর জন্য।
ছেকেনের স্ত্রী শাবান বেগম বলেন, ‘রবি পাট ভাল হইছে। যারাই জমির পাশ দিয়া যায় তারাই বলে, কতো সুন্দর আর ডাগর পাট হাইছে। আমাগো ওই জমিতে এর আগে এক ভাল পাট হয় নাই।’
পাটের আশ দেখে উৎফুল্ল কৃষক নইমুদ্দিন। বার বার এই প্রতিনিধিকে আশ ধরে দেখিয়ে বলছেন, ‘দেখেন, দেখেন আমার পাটের আশ কত ভাল হইছে। কত মোটা হইছে। রঙটা কেমন ঝক ঝক করতেছে সোনার লাহান।’
পাশের তালমা গ্রামের কৃষক মো. মোশাররফ জানান, তিনি মোট পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন তোষা ও ভারতীয়। বলেন, আমি, দেখেছি আমার রোপন করা পাটগাছ থেকে রবি-১ জানের পাট গাছগুলি বড় ও সতেজ হয়েছে। ‘পাট গাছ ভাল হলেতো আর ভাল হলো না, আশ নিয়ে কথা’-মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আশ ধুইয়া হাটে নিয়া মাইপ্পা বুঝবো কোনডা ভালো। আমাগো কাছে প্রমাণ নিয়া কথা। রবি যদি ভাল হয় তবে আগামীতেই রবিই লাগাবো।’
চৌশারা গ্রামের গ্রামের কৃষক মোজাহার শেখ সতর্কতার সাথে বলেন, রবি পাট ভাল হইছে। আবার আমরা দেশী জাতের যে পাট লাগাইছি সেটাও কম খারাপ হয় নাই। তবে কেমন আশ পাওয়া যায় সেটাই বড় কথা।
ওই প্রকল্পের বায়োটেকনোলজিস্ট শাহ্ মো. তামিম কবীর জানান, আমারা পরীক্ষা করে দেখেছি এক হেক্টর জমিতে তোষা ও ভারতীয় পাটের চাইতে রবি-১ পাটের ফলন বেশী। এক হেক্টর জমিতে তোষা পাটের গাছ হয়েছে তিন লাখ আট হাজার ৭২৭টি এবং ভারতীয় জাতের হয়েছে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৭২৭টি সেখানে রবি-১ হয়েছে তিন লাখ ৫৭ হাজার ৮৫৮টি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গাছের উচ্চতার দিকে থেকেও এগিয়ে রবি-১। গড়ে রবি-১ বিজের একটি গাছের উচ্চতা যেখানে তিন দশমিক ৩০ মিটার সেখানে তোষা ও ভারতীয় জানের গাছের উচ্চতা যথাক্রমে তিন দশমিক ১৫ ও তিন দশমিক ১৪ মিটার। তিনি বলেন, আমরা ধরনা করছি রবি-১ পাট রোপন করা হলে ফলন অন্য পাটের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ ভাগ বেশী পাওয়া যাবে।
ওই প্রকল্পের প্রগ্রাম ম্যানেজার ড. মো শহীদুল ইসলাম জানান, পাটের ফাইবার কোয়ালিটি ভাল হয় যদি আশে লিগনিন এর পরিমান কম হয়। আমরা ধারনা করছি রবি-১ পাটে অন্য জাতের পাটের তুলনায় লিগনিন এর পরিমান ২% কম হবে।
মো শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, ফরিদপুরের যে তিনটি জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে রবি-১ পাট রোপন করা হয়েছে তা তিন ভাগ করে রোপনের ১০০ দিনে, ১১০ দিনে এবং ১২০ দিনে তিন ধাপে কাটা হচ্ছে। তিন ধাপে কাটা পাট আলাদা আলাদা ভাবে জাগ দিয়ে আমরা দেখতে চাই রোপনের কতদিন পর পাট কাটলে সবচেয়ে ভাল আশ পাওয়া যায়।
ফরিদপুর পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মজিবর রহমান বলেন, পাটের জিন অবিস্কার আমাদের জন্য বিরাট একটি সাফল্য। এই সাফল্য বাস্তবেও ফলপ্রসু হবে যদি আমরা এর সুফল কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। সে লক্ষেই কাজ করছে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট।

Leave a Reply