মেয়র আনিসুলের জানাজায় লাখো মানুষের ঢল: বনানীতে দাফন ॥ ভয়েস অব ফরিদপুর

ভয়েস অব ফরিদপুর রির্পোট ॥
এক রাজার গল্প বলে নিজের টিভি অনুষ্ঠান অন্তরালের ইতি টেনেছিলেন আনিসুল হক, ভক্তদের চোখে সেই রাজার মতোই চির বিদায় নিলেন আনিসুল হক।শনিবার বিকালে ঢাকার বনানী কবরস্থানে সমাহিত করার পর ভক্তরা বলেন, মেয়র হিসেবে আনিসুল হককে কখনও ভুলতে পারবেন না তারা।ক্ষমতাসীন দলটির সঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও আনিসুল হককে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির ছিলেন বিএনপি নেতারাও, উপস্থিত হয়েছিলেন নানা মতের ব্যবসায়ীরাও। যে দল থেকে আনিসুল হক মেয়র হয়েছিল, সেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলছেন, ওই দায়িত্ব পালনের জন্য দ্বিতীয় আনিসুল হক আর পাওয়া যাবে না।দুপুরে লন্ডন থেকে মরদেহ আসার পর বনানীর বাড়িতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আর্মি স্টেডিয়ামে জানাজা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের। তারপর কফিন নেওয়া হয় বনানী কবরস্থানে।আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক লন্ডন থেকে মরদেহ নিয়ে আসার পর বিমানবন্দর থেকে বনানী কবরস্থান পর্যন্ত পুরো সময় উপস্থিত ছিলেন ভাই সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক।

আনিসুল হকঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হকের কুলখানি ৬ ডিসেম্বর বুধবার। সেদিন গুলশানের আজাদ মসজিদে বাদ আসর তাঁর কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে আর্মি স্টেডিয়ামে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। পরে তাঁর মরদেহ বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন, স্পিকার শিরীন শারমিনের পক্ষে ক্যাপ্টেন মোশতাক আহমেদ, আওয়ামী লীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন এবং সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ ছাড়া বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, বিকেএমইএসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।শনিবার বেলা একটায় আনিসুল হকের মরদেহ বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজটি (বিজি ০০২) হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।এ সময় বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। আনিসুল হকের ছোট ভাই সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিউল হকও এ সময় উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন মেয়রের একান্ত সচিব আবরাউল হাসান।আবরাউল হাসান বলেন, মেয়রের মরদেহের সঙ্গে দেশে এসেছেন তাঁর স্ত্রী রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হক, দুই মেয়ে ওয়ামিক উমায়রা ও তানিশা ফারিয়াম্যান হক।বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানীর বাসভবনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়ে মেয়রের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। এই পুরোটা সময় স্বামীর সঙ্গে থাকা ররুবানা স্বামীর মরদেহ নিয়ে বনানীর বাড়িতে যাওয়ার পর সেখানে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুবানা। শেখ হাসিনা আনিসুল হকের মরদেহের সামনে মোনাজাত করেন। এরপর রুবানা ও তার সন্তানদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন।

এ ছাড়া বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান।এরপর প্রয়াত এই মেয়রের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। সেখানকার চারটি ফটক দিয়ে হাজারো মানুষ সারিবদ্ধভাবে স্টেডিয়ামে ঢোকেন।একে একে সবাই মেয়রকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান। তোফায়েল সাংবাদিকদের বলেন, একদিকে তার সততা ছিল, অন্যদিকে তার যোগ্যতা ছিল। যতদিন ঢাকা মহানগর থাকবে, মানুষের স্মৃতিতে তিনি অক্ষয় হয়ে বিরাজ করবেন।স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন আনিসুল হকের কফিনে।আমীর খসরু সাংবাদিকদের বলেন, নির্দলীয় অবস্থান থেকে স্থানীয় সরকার যে চালানো যায়, উন্নয়ন করা যায়, সেটা তিনি রেখে গেছেন।ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, আনিসুল হকের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালও যান আনিসুল হকের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে।

জাফর ইকবাল সাংবাদিকদের বলেন, তিনি (আনিসুল হক) ঢাকা শহর নিয়ে যে স্বপ্ন দেখে গেছেন, কেউ
না কেউ যেন তার স্বপ্নগুলো পূরণ করে তাকে শান্তি দেয়।ব্যবসায়ী নেতাদের অনেকে উপস্থিত হন বিজিএমইএ ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আনিসুল হকের বনানীর বাড়িতে।বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ সাংবাদিকেদর বলেন, তিনি ছিলেন আমাদের ব্যবসায়িক লিডার। তার চলে যাওয়ায় দেশের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে।আনিসুল হককে এফবিসিসিআইর ‘সফলতম সভাপতি’ অভিহিত করেন তার মেয়াদের পর ওই দায়িত্ব পালনকারী এ কে আজাদ।গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাঁকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তাঁর কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়। কিন্তু মঙ্গলবার মেয়রের পরিবারের একজন সদস্য বলেন, রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর তাঁ ফুসফুসও আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মারা যান মেয়র আনিসুল হক।চার মাস আগে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ৬৫ বছর বয়সী আনিসুল হক, ধরা পড়ে ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’য়ে আক্রান্ত তিনি সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে এফবিসিসিআইর সভাপতি ছিলেন আনিসুল হক। তার আগে বিজিএমইএর সভাপতিও ছিলেন তিনি। মোহাম্মদী গ্র“পের চেয়ারম্যান আনিসুলের তৈরি পোশাক ছাড়াও বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন, কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা রয়েছে। ডিজিযাদু ব্রডব্যান্ড লিমিটেড এবং নাগরিক টেলিভিশনের মালিকানাও আছে তার ব্যবসায়িক গ্র“পের।টিভি উপস্থাপনা দিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া আনিসুল হক পরে ব্যবসায়ীদের নেতা হিসেবে চেনামুখ ছিলেন, তবে রাজনীতিতে তা পা রাখা আকস্মিকভাবেই ঘটে।

২০১৫ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে তাকে প্রার্থী করে, তখন তা চমক হিসেবেই দেখা গিয়েছিল।শুক্রবার লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক জামে মসজিদে প্রথম জানাজার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের কথায়ও তা ফুটে ওঠে- আমরা অনেকে অবাক হয়েছিলাম তিনি যখন রাজনীতিতে যোগদান করেন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এই দুই বছরে অবৈধ দখল উচ্ছেদসহ বেশ কিছু বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে অনেকের নজর কেড়েছিলেন আনিসুল হক। ঢাকার কূটনীতিকপাড়া বারিধারা ও গুলশানের বিভিন্ন দূতাবাসের দখলে থাকা ফুটপাতও দখলমুক্ত করেন মেয়র আনিসুল। পরিবহন শ্রমিকদের বিরোধিতার মুখেও তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের সড়ক দখলমুক্ত করেছিলেন তিনি।এছাড়া সড়ক প্রশস্তকরণ, ঢাকা চাকা, বিলবোর্ড উচ্ছেদ, গ্রিন ঢাকা কর্মসূচিসহ বেশকিছু উদ্যোগের জন্য আলোচিত হন তিনি।তবে অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারার বাইরে আনিসুল হক তেমন মনোযোগ দেননি বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।নাতির জন্ম উপলক্ষে গত ২৯ জুলাই রুবানা ও আনিসুল হক যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৩ অগাস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর থেকে হাসপাতালেই ছিলেন তিনি; তারপর আর জীবনে ফিরলেন না তিনি।

Leave a Reply