শীতে ‘উষ্ণতা’ রাজনীতিতে ‘শীত’

নিজস্ব প্রতিবেদক : শুধু আমাদের দেশ কিংবা দেশের মানুষ নয়, বদলে যাচ্ছে প্রকৃতিও। এই ঘোর শীতকালেও শীতের দেখা নেই। শীতের তীব্রতা না ছড়িয়েই পৌষ বিদায় নিতে শুরু করেছে। শৈত্যপ্রবাহ কবে আসবে-এই আকাক্সক্ষা নিয়ে প্রহর গুণছে শীতবিলাসী মানুষ। তাপমাত্রা নামতেই চাচ্ছে না। মাঘমাসে তাপমাত্রা যদি নামে-তবেই এবার রাজধানীবাসী শীতের সাক্ষাৎ পেতে পারে!
এদিকে রাজনীতির ‘তাপ’ ক্রমেই কমছে। বিএনপির মুখপাত্ররা নানা গরম বোলচাল ছেড়ে কর্মীদের চাঙ্গা করার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু তাতে রাজনীতির পারদ উত্তপ্ত হচ্ছে না! ৫ জানুয়ারি, ‘গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’ ও ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’কে ঘিরে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কিছুটা চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ‘শক্তি’র দাপটের কাছে বিএনপির ‘আত্মসমর্পণ’ শেষপর্যন্ত পরিস্থিতিকে শান্তই রাখে। রাজনীতিতে আপাতত ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধি’র তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
আমাদের দেশে শীত ও রাজনীতির মধ্যে একটা বিস্ময়কর সম্পর্ক আছে। যদিও শীত ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রসঙ্গ। একটির সঙ্গে অপরটির বৈধ ও যৌক্তিক কোন সম্পর্ক থাকার কথা নয়। শীত হচ্ছে প্রকৃতির খেলা। আর রাজনীতি হলো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার কলা-কৌশল। একে প্রহসনও বলা যেতে পারে। শীত আসে আবার শীত চলেও যায়। কিন্তু রাজনীতির ‘প্রহসন’ শেষ হয় না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে তা চলতেই থাকে।
শীত আমাদের যতই শীতল ও শীতার্ত করুক না কেন এ নিয়ে তেমন কোন আলাপ-আলোচনা তোলপাড় বা লেখালেখি হয় না। অথচ রাজনীতি নিয়ে আমাদের দেশে কী তোলপাড়ই না হয়! রাজনীতি নিয়ে বক্তৃতা, বিবৃতি, সংবাদ, সংবাদ ভাষ্য, কলাম, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সমীক্ষা কতই না আয়োজন। আমাদের দেশের রাজনীতি অবশ্য প্রধান দুটি শিবিরে বিভক্ত। একপক্ষে আছে আওয়ামী লীগ; অন্য পক্ষে বিএনপি। একপক্ষ অপরপক্ষকে দেখে নেয়ার চেষ্টায় সারাক্ষণ তৎপর। কে কাকে ঘায়েল করতে পারে, জব্দ করতে পারে রাজনীতি যেন তারই সাধনা। এই রাজনীতি নিয়ে দলাদলি, সংঘর্ষ, কোন্দল, হুমকি-ধমকি কোন কিছুরই কমতি নেই। রাজনীতি মানেই হচ্ছে উত্তাপ, গণ্ডগোল, বিশৃঙ্খলা, উত্তেজনা। সেখানে শীত অত্যন্ত উপেক্ষিত ও অবহেলিত ইস্যু। অথচ শীত আমাদের জীবনে কম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। শীতের প্রকোপ বাড়লে জীবনযাত্রা অচল হয়ে যায়। স্থবির হয়ে যায় সব কিছু। সেই শীতকে নিয়ে কেন এমন উপেক্ষা সেটাও একটা রহস্য বটে। শীত মারাত্মক সব উপাদান নিয়ে হাজির হয়। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে ভীষণ প্রভাব ফেলে। আমাদের পোশাক, খাদ্য তালিকা, চলাফেরা, ভোগ-দুর্ভোগ সব কিছুই পাল্টে যায়। সেই শীতকে নিয়ে কী নির্মম উদাসীনতা! বাংলা সাহিত্যের ‘বিষণœতম’ কবি জীবনানন্দ দাশের কিছু কুয়াশাচ্ছন্ন কবিতা ছাড়া শীতকে নিয়ে তেমন সাহিত্য কর্মও চোখে পড়ে না।
শীতকালকে আমরা যত উপেক্ষাই করি না কেন, এ সময় রাজনীতি কিন্তু বেশ জমে ওঠে। রাজনীতির ভরা জোয়ার বা তেজকটাল বলা যায় এই শীতকালকে। আমাদের জাতীয় জীবনের সব তাৎপর্যময় দিবসগুলোও এ শীতকালেই। ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্র“য়ারি, ২৬ মার্চ সবই হচ্ছে শীতকালীন ঘটনা। এরশাদের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানও সংঘটিত হয়েছে শীত কালেই।
আসলে শীতকালে এদেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের তেজ চাড়া দিয়ে ওঠে। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে শীতের সবজি। নানা জাতের, নানা স্বাদের বিচিত্র টাটকা সবজি খেয়ে শরীরের মধ্যে এক ধরনের টগবগে ভাব আসা স্বাভাবিক। আর শরীরে তেজ থাকলে, তেল থাকলে তা বের হবেই। এই তেজের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আন্দোলন, মানি না মানবো না-ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। কথায়ও আছে পেটে খেলে পিঠে সয়। আন্দোলন তো এক ধরনের পিঠে সওয়াই। হামলা-মামলা, ধাওয়া, লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস, চিৎকার, স্লোগান, দৌড়-ঝাঁপ ইত্যাদিতে শক্তি ক্ষয়ের সম্মিলিত যোগফল। পেটে খাবার না থাকলে, তেজ না থাকলে কী আর এসব করা সম্ভব?
একবার শীতের শাক-সবজির কথা ভাবুন। বলিউডের মন-কেমন করা নায়িকাদের মতো ধবধবে ফুলকপি, আঁটসাঁট নববধূর মতো বাঁধাকপি, ঘুষখোর ট্রাফিক সার্জেন্টের পাটকরা পোশাকের মতো চকচকে শিম, কুমারীর রাঙা ওষ্ঠের মতো টকটকে লাল টমেটো, কিশোরের রঙিন স্বপ্নের মতো সুন্দর সুন্দর গাজর, সুলতানের আঁকা স্বাস্থ্যবান ছবির মতো ঢাউস ঢাউস বেগুন আর হালকা সবুজ কচি লাউ, সাদায় মেশানো রাক্ষুসে সাইজের মুলা, পালঙ্কে রাখার মতো গাঢ় সবুজ পালং শাক, সাপের মতো লকলকে লাউডগা আরও কতো কী!
কই মাছ দিয়ে ফুলকপির তরকারি, চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ বা বাঁধাকপির ঘণ্ট, আলু-বেগুন-শিম-কপি সহযোগে পাঁচফোড়ন দেয়া তরকারি, ডালের বড়াসহ মাগুর কিংবা বোয়াল মাছের হালকা ঝোল, ধনিয়া পাতা কাঁচা মরিচ সহযোগে বাটা, ফুলকপির সঙ্গে বেসন মিশিয়ে বড়া, সর্ষে ফুলের বড়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, গরম মুড়ি, মাদকতা মেশানো খেজুর রস ও খেজুর গুড়, নানা জাতের পিঠা, হাঁস কিংবা পাঠার মাংস-এমনি অসংখ্য উপাদেয় খাদ্যসুখ আমাদের ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে’ উচ্চারণ করতে উৎসাহিত করে। আসলে শীতকালটা হচ্ছে সুখের কাল, উপভোগের কাল (দরিদ্রদের জন্য নয়, অবশ্যই। তাদের নিয়ে এদেশে কেউ কী ভাবে? তাদের জন্য এ লেখাও নয়)!
আমাদের দেশে শীতের রাজনীতি আছে, তবে শীতকে নিয়ে রাজনীতি এখনও শুরু হয়নি। বন্যার সময় যেমন বলা হয় ‘ভারতীয় বন্যা’, শীতকে তেমনভাবে ভারতীয়, পাকিস্তানি কিংবা পশ্চিমা শীত বলার প্রবণতা এখনও শুরু হয়নি। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের যে স্বভাব, তাতে অচিরেই হয়ত শীতকে নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা বলবে, এই শীত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও লুটপাটেরই ফল। এ সরকারকে ক্ষমতা থেকে না সরালে শীতসহ যাবতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। কাজেই আসুন, জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। এ সরকারকে উৎখাত করার শপথ গ্রহণ করি।
পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ বলবে, এই শীত জঙ্গি শীত, জামায়াত-বিএনপিওয়ালারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ অবৈধ শীতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটা বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের চক্রান্ত। একটি মহল শীতের ধোয়া তুলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু জনগণ তা হতে দেবে না।
যাহোক, শীতের আরেকটি বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের মাথার নার্ভগুলো এ সময় কেন জানি ঢিলা হয়ে যায়। হাইকোর্টের সামনের মোড়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, এমনকি কেবিনেটে পর্যন্ত অসংলগ্ন চিন্তাভাবনাকারীর সংখ্যা বেড়ে যায়। রাস্তাঘাটে ‘শ্রীপুরের বটিকা’সহ নানা রকম চুলকানির মলম, জটিল-কঠিন-দুরারোগ্য সব রোগের ওষুধ, সালসা, তাবিজ ইত্যাদি নিয়ে ক্যানভাসাররা আবির্ভূত হয়। বিরোধীদল ও জোটের আন্দোলন আন্দোলন খেলা, চূড়ান্ত আন্দোলনের হুমকি, ক্ষমতাসীনদের লুটপাট, দুর্নীতি ও মিথ্যাচার উৎসব, বই মেলা, পিকনিক, বিয়ে, সম্মেলন, খুন-হত্যা-সড়ক দুর্ঘটনা, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি শীতকালে প্রকট হয়ে দেখা দেয়। পুরনো বাতের ব্যাথা, অম্লতা, পিত্তশূল, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিসসহ নানা রকম কোল্ড-ডিজিজ শীতের অতিথি পাখির মতো ব্যাপকভাবে আবির্ভূত হয়।
আজ থেকে বহু বছর আগে এক শীতপ্রধান দেশের মহাকবি লিখেছিলেন, ‘শীতের বাতাস তুমি বও, তুমি বও/মানুষের অকৃতজ্ঞতার মতো তুমি নির্দয় নও।’ কবির সেই দেশে মানুষ ছিল। সে মানুষের মধ্যে অকৃতজ্ঞতাও ছিল যা নিয়ে কবি ক্ষুব্ধ কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে তেমন ‘মানুষ’ নেই। এখানে একদল আছে নেতা, অপরদল জনতা। একদল প্রভু, অন্যরা ভৃত্য। প্রভুদের জীবনে শীত স্পর্শ করে না, স্পর্শ করে রাজনীতি। এই রাজনীতিকে পুঁজি করে তারা সব কিছু বাগিয়ে নেয়। ভোগ-লালসা, সুখ-সচ্ছলতা, আনন্দ-উৎসব সব কিছু। কিন্তু এই রাজনীতি জনতারূপী ভৃত্যদের স্পর্শ করে না। তাদের জীবনে বঞ্চনা ছাড়া অন্য কোনো যৌতুক নেই। কোটরাবদ্ধ ব্যাঙের মতো গুটিসুটি মেরে কোনরকমে নিশ্চুপ তাদের বেঁচে থাকা!

Leave a Reply