সোনার কাঠির র্স্পশে বদলে গেল আলফাডাঙ্গা এসিল্যান্ড অফিস ॥ ভয়েস অব ফরিদপুর

ভয়েস অব ফরিদপুর রির্পোট ॥
গত চার মাস আগে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়ে ঢুকতে গেলেই হোচট খেতে হত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ন সরকারী অফিসে যে বেহাল দশা ছিল তা অকল্পনীয়। অফিস চত্বর থেকে শুরু করে আশ পাশের এলাকাকে ভাগাড়ের সাথে তুলনা করলেও কম হত। ময়লা আবর্জনা, গর্ত, কাদামাটি, জরাজীর্ন অবস্থা আর দূর্গন্ধে এই অফিসে ঢোকাই দায় ছিল। এই অবস্থায় গত অক্টোবরের ৮ তারিখে এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন মোঃ আবুল হাসেম রনি। তার পরই যেন এসিল্যান্ড অফিস সোনার কাঠির স্পর্শ পেল। বদলে যেতে লাগলো অফিসের বাহ্যিক চেহারাসহ দাপ্তরিক কর্মকান্ড। পরিবর্তনের সে হাওয়া রুপকথাকে হার মানাল। মাত্র চার মাসে তিনি এসিল্যান্ড অফিসকে স্বপ্নপুরীতে রুপান্তরিত করলেন। সেই ভাগাড়, কাদামাটি আবর্জনা আর গর্তের স্থানে এখন সুশোভিত ফুলের বাগান, বাগানের মাঝ দিয়ে বাধাই রাস্তা, সেবাগ্রহিতাদের জন্য দৃষ্টিনন্দন অপেক্ষাগার সব মিলিয়ে একটি স্বপ্নীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে আলফাডাঙ্গা ভূমি অফিসে। সেই ভাগাড় থেকে এখনকার স্বপ্নীল পরিবেশের মূল কারিগর হচ্ছেন এসিল্যান্ড মোঃ আবুল হাসেম রনি।
জানা যায়, ২০১৭ সালের অক্টোবরে বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবুল হাসেম রনি যোগদানের পর ভূমি ব্যবস্থাপনায় ইনোভেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রথমেই ভূমি অফিসকে নান্দনিক ও জনবান্ধব ভূমি অফিসে রুপান্তরিত করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন তিনি।
উপজেলা ভূমি অফিসের চারপাশ অত্যন্ত নিচু ও জলাবদ্ধ ছিলো। যার ফলে সেবাগ্রহিতাদের চলাচল ও অবস্থান করে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে সমস্যা হত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পেত না। তাছাড়া চারপাশে কোন বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় মাদকসেবীরা রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে মাদক সেবন করতো। ভূমি অফিস ছিলো অরক্ষিত। তাই ভুমি অফিসের সামনের অংশে মাটি ভরাট করে ফুলের বাগান (স্বপ্নিল চত্বর) ও আগন্তুক জনসাধারণের বিশ্রাম নেয়ার জন্য গোলঘর (মাটির মানুষ) এবং দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। যার ফলে ভূমি অফিসের সুরক্ষার পাশাপাশি সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি ও জনবান্ধব ভূমি অফিসরুপে গড়ে উঠেছে।
আলফাডাঙ্গা উপজেলাটি মধুমতি ও বারশিয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। এখানে নদী ভাঙন প্রবল। যার ফলে মানুষ অনেক দূরদুরান্ত থেকে নদী পেরিয়ে আসতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। নদী সিকস্তী ও পয়স্তীর ফলে জমির রেকর্ড সমস্যা ও স্থানীয় জনগণের মাঝে প্রতিনিয়ত মারামারির ঘটনা ঘটে থাকে। যার ফলে প্রচুর ল্যান্ড এন্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়ে থাকে এবং জনগণের ভোগান্তি বৃদ্ধি পায়। যার ফলে জনগনের যে কোন তথ্য ও অভিযোগ প্রদানের জন্য চালু করা হয়েছে হট লাইন মোবাইল নাম্বার । ভূমি বিষয়ক যে কোন তথ্য জানতে এই নাম্বারে কল করলে উপজেলা ভূমি অফিস সে তথ্য সেবা প্রদান করে থাকে। মোবাইল হট লাইন চালু হবার পর প্রতিনিয়ত দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই কল করে এ সেবা নিচ্ছেন বলে জানা যায়।
যে কোন তথ্য ও অভিযোগ জানানোর জন্য স্থাপন করা হয়েছে ‘অভিযোগ বক্স’। যেকোন নাগরিক সেবা পেতে অসুবিধা হলে তাঁর অভিযোগটি নির্ধারিত বক্সে রাখেন। এতে করে এক ঘন্টা সময়ের মধ্যেই ওই নাগরিককে ফোনের মাধ্যমে অথবা সরাসরি তাঁর সমস্যার সন্তোষজনক জবাব প্রদান করে ভূমি অফিস।
দিনটি ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। বেলা ১১টা। আলফাডাঙ্গা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়ে ঢুকতেই দেখা গেল সুশোভিত ফুলের বাগান। রঙ বেরঙের ফুল আর ফুলের সুগন্ধে এক স্বপ্নের রাজ্যে প্রবেশ করেছি বলে মনে হল। সামনে এগিয়ে অফিসে ঢুকতেই ফ্রন্ট ডেস্ক। সেখানে বসা অয়ন বিশ্বাস নামের এক অফিস কর্মচারী। ফ্রন্ট ডেস্কের পাশেই টাঙানো সিটিজেন চার্টার। তার সাথে কথা বলতে বলতে অফিসের ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করতেই দেখা গেল গন শুনানীর সাইনবোর্ড, সেখানে কি বার গনশুনানী চলে তার সুনির্দিষ্ট দিন ও সময় লেখা। তার পাশেই ফরিদপুর ব্রান্ডের মনোগ্রাম। একটি সুসজ্জিত রুমে বসে দাপ্তরিক কাজ করছেন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তার পাশেই এসিল্যান্ড আবুল হাসেম রনির ছিমছাম সুসজ্জিত কক্ষ।
সুরুচি সম্পন্ন অমায়িক এই কর্মকর্তার সাথে কথা হল। এসিল্যান্ড আবুল হাসেম রনি জানালেন সরকারি সেবা গ্রহিতারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে দ্রুত তাদের সেবা পেতে পারে সেদিকে আমরা সার্বক্ষনিক নজর দিচ্ছি। অফিসের ভিতরে ও বাইরের পরিবেশকে আমরা সেবা গ্রহিতাদের স্বাচ্ছন্দ্যে বিধানের লক্ষে তৈরি করেছি। পরিবেশ যেমন সুন্দর এই অফিসের তেমনি ঘুষ দুর্নীতির মত অসুন্দর জিনিসকেও আমরা বিতারিত করেছি এখান থেকে।
তিনি বলেন, আমি যখন আলফাডাঙ্গায় যোগদান করি তখন অফিসের সামনে গর্ত ছিল। জলাবদ্ধতার কারনে সেখানে ময়লা আবর্জনার দূর্গন্ধ বেরোত। যোগদানের পরে সেখানে মাটি দিয়ে ভরাট করেছি। অফিসের চারপাশের প্রাচীর ছিল না, সেখানে রিক্সা স্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড ছিল। সেগুলো অপসারন করে প্রাচীর নির্মান করেছি। অফিসের কক্ষগুলো জরাজীর্ন ছিল সেগুলো মেরামত করে পরিপাটি করা হয়েছে। টিউবয়েল স্থাপন করেছি। বিশেষ করে অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করেছি। সেবা গ্রহিতাদের জন্য হট লাইনের ব্যবস্থা করেছি। যাতে দূর দূরান্তের সেবা গ্রহিতারা ঘরে বসেই সেবা পেতে পারেন। তিনি আরো জানান, সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা যাতে বিশ্রাম নিতে পারে সেজন্য অফিসের সামনেই ‘মাটির মানুষ’ নামে একটি বিশ্রামাগার নির্মান করা হয়েছে। সেবা গ্রহিতারা যাতে হয়রানীমুক্ত হয়ে দ্রুত সেবা নিতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। দালাল চক্রকে অফিস চত্বর থেকে উৎখাত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে অনেক অফিসিয়াল নথি খুঁজে পাওয়া যেত না, সে অব্যবস্থা দূর করতে অফিসে হোয়াইট বোর্ড টাঙ্গানো হয়েছে। সেখানে নথির তালিকা লেখা আছে। কোন নথিটি কার কাছে বা কোথায় আছে সেটা বোর্ড থেকে তাৎক্ষনিকভাবে জানা যাবে। এর ফলে অফিসের নথি সুরক্ষিত থাকবে। তিনি বলেন, অফিস এলাকায় ওয়াই ফাই জোন স্থাপন করা হয়েছে।
এসিল্যান্ড বলেন, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে রেকর্ডরুকে সুবিন্যস্ত আকারে সাজানো হয়েছে। মৌজাওয়ারি রেকর্ডসমুহকে ডিজাটাইলাইজড করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্যাটেলাইট ইমেজের সাহায্যে খাস জমিসমূহের মৌজাওয়ারী অবস্থান চিহ্নিত করা হচ্ছে। জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) এবং ল্যান্ডস্যাট ইমেজারি ব্যবহারের মাধ্যমে সহজেই খাসজমি সমূহ চিহ্নিত করা যায়। যার ফলে ভূমিদস্যুদের কবল থেকে সরকারী জমি, খাল-বিল, রাস্তা, হালট, হাট-বাজার, পুকুর, ধ্বংস ও দখল মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ভূমি সেবার উদ্ভাবনী চর্চার অন্যতম পথিকৃত ও পথপ্রদর্শক সাবেক বিভাগীয় কমিশনার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ স্যারের পথ অনুসরন করে জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া স্যারের দিক নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণার ফলে এসিল্যান্ড অফিসকে জনবান্ধব অফিসে পরিনত করা সম্ভব হয়েছে। একাজে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়ন্তী রুপা রায় স্যারও আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন।
জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনা সেবা জনগনের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ভূমি অফিসকে জনবান্ধব করার যে প্রতিশ্রুতি সহকারী কমিশনাররা আমাকে দিয়েছিলো তারই অংশ হিসেবে এসমস্ত কাজ বাস্তবায়ন করছে তারা। এঅবস্থা যাতে অব্যাহত থাকে তিনি এ আশা ব্যক্ত করেন।
এ ছাড়াও উপজেলা সহকারী কমিশনার সপ্তাহের প্রতি সোমবার যে কোন একটি তহশিল অফিসে (ইউনিয়ন ভূমি অফিস) গিয়ে গণশুনানি করেন। এতে ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানি রোধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তিনি।
দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে একটি টিম গঠন করেন। ‘টিম আলফা’ নামের এই দলটি ইতিমধ্যেই আলফাডাঙ্গায় ৭-৮ টি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে টিম আলফা গঠন করেন এসিল্যান্ড আবুল হাসেম রনি। এছাড়া মাদক প্রতিরোধেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
সেবা গ্রহিতাদের সাথে কথা বলেও এসিল্যান্ডের কথার মিল পাওয়া গেল। বাংলাদেশের সব এসিল্যান্ড অফিস যদি এরকম হত তবে এদেশের চেহারাই বদলে যেত অভিমত সেবাগ্রহিতাদের। তারা এধরনের একটি দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ ও ঘুষ দুর্নীতি হয়রানীমুক্ত কার্যালয়ের জন্য এসিল্যান্ড আবুল হাসেম রনির ভূয়সি প্রশংসা করেন।
এসিল্যান্ড মোঃ আবুল হাসেম রনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিওগ্রাফিতে অনার্সসহ মাস্টার্স করেন। ৩৩ তম বিসিএসে উত্তীর্ন হয়ে প্রশাসনে যোগদান করেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি জয়পুরহাট জেলায় কর্মরত ছিলেন। তারপর কিশোরগঞ্জের এনডিসি’র দায়িত্ব পালন শেষে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন। তার বাড়ি কমিল্লা সদরের বরুরা গ্রামে। ৫ ভাই, ২ বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত। তার সহধর্মিনী ডা. সাদেকা সুলতানা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন।

Leave a Reply