গুম নিয়ে উদাসীন বাংলাদেশ সরকার : হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তৃক শত শত মানুষকে আটক ও গুম বিষয়ে ৮২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নিখোঁজেদের মধ্যে কয়েকজন বিরোধী দলের নেতাও রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘তিনি আমাদের কাছে নেই : বাংলাদেশে গোপন আটক আর গুম’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে কেবল ২০১৬ সালেই গুম হওয়া ৯০ জনের তথ্য রয়েছে। যাদের বেশিরভাগকে এক সপ্তাহ বা একমাস গোপন জায়গায় আটকে রাখার পর আদালতে হাজির করা হয়েছে। সংস্থাটি অবিলম্বে এই প্রবণতা বন্ধ করে এসব অভিযোগের তদন্তের পাশাপশি নিখোঁজদের পরিবারের কাছে ব্যাখ্যা তুলে ধরে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে।হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে তথ্য রয়েছে যে, এরকম আটক ২১জনকে পরে হত্যা করা হয়েছে আর নয়জনের কোন তথ্যই আর জানা যায়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৯০জনের তালিকায় মানবতা বিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর হওয়া তিন বিরোধী নেতার তিন সন্তান রয়েছে, যাদের একজন ছয়মাস পরে ফিরে এসেছেন। বাকিদের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এরকম ৪৮জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘নিখোঁজের বিষয়ে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকলেও, বাংলাদেশের সরকার এই বিষয়ে আইনের খুব একটা তোয়াক্কা করছে না। মানুষজনকে আটক করে তারা দোষী না নির্দোষ নির্ণয় করা, শাস্তি নির্ধারণ করা, এমনকি তারা বেঁচে থাকবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাও যেন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের যেন এই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।’ ওই প্রতিবেদনে বিরোধী বিএনপির ১৯জন কর্মীর তথ্য রয়েছে, যাদের ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলে নেয়া হয়। প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নিখোঁজ পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ একশ’ জনের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সেখানে পুলিশের কাছে করা অভিযোগ ও অন্যান্য আইনি কাগজপত্রও রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলেও তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। এ ধরণের ঘটনায় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের বিরুদ্ধে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ অভিযোগ রয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি আদনান চৌধুরীকে তুলে নিয়ে যায় র‍্যাবের সদস্যরা। তার বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী সংস্থাটিকে বলছেন, তাদের বলা হয়েছিল, পরদিন র‍্যাব সদস্যরা তাদের ছেড়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘তারা বললো, আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি, আমরাই আবার তাকে ফেরত দিয়ে যাবো। কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের পরিবারের কাছে একজন জ্যেষ্ঠ র‍্যাব কর্মকর্তা গোপনে জানিয়েছেন, সুমনসহ আরো পাঁচজন তার হেফাজতে ছিল। কিন্তু তিনি তাদের হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর অন্য র‍্যাব কর্মকর্তারা তাদের নিয়ে যান। তার ধারণা, এই ছয়জনের কেউ বেঁচে নেই। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, এ ধরণের আটকের ঘটনা সবসময়ে অস্বীকার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তারাও তাদের এই দাবির সমর্থন দিয়ে আসছেন। বরং কখনো কখনো উল্টো বলা হয় যে, এসব ব্যক্তিরা নিজেরাই লুকিয়ে রয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এ ধরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও গ্রহণ করে না পুলিশ। সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারের উচিত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে এসব অভিযোগ তদন্ত করার আহবান জানানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কর্মকর্তা ব্রাড অ্যাডামস বলছেন, ‘বাংলাদেশের সরকার এসব অভিযোগ নাকচ না করে নীরব থাকছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও চুপ করে থাকছে। এই নীরবতার অবসান হওয়া উচিত। বিবিসি বাংলা

Leave a Reply