জীব‌নের গল্প

রওনক নূর : বাড়ী‌তে হা‌সির আসর ব‌সে‌ছে। খু‌ড়ি‌কে না‌কি কেউ একজন বি‌য়ে কর‌তে চে‌য়ে‌ছে। এটাও কি সম্ভব ? নিশ্চয় কেউ ও‌কে নি‌য়ে মজা করার জন্য এসব ব‌লে‌ছে। আজ বয়স্ক ভাতা আন‌তে যাবার সময় ভ্যা‌নে এক‌টি লোক গল্প কর‌তে কর‌তে যাবার সময় তা‌কে বি‌য়ের প্রস্তাব দি‌য়ে‌ছে। সবার হাসাহা‌সি নি‌য়ে খু‌ড়ির কোন মাথা ব্যাথা নেই । কারণ ও জা‌নে যে ও‌কে কেউ ভা‌লোবাস‌বে না। আর বি‌য়ে তো অ‌নেক দু‌রে। যখন বয়স ছি‌লো তখনই কেউ তাকায়‌নি আর এখন তো বয়স অ‌নেক বে‌ড়ে গে‌ছে। এক এক জন বিষয়টা নি‌য়ে এ‌কেক রকম ভাব‌তে লাগ‌লো। কেউ ব‌লে ম‌নে হয় কা‌নের দুলটা সোনার ভে‌বে ওটা নেবার জন্য এই ফাঁদ ক‌রে‌ছে। কেউ ব‌লে বয়স্ক ভাতার টাকাটা নি‌য়ে নেবার জন্য এমন‌টি ক‌রে‌ছে।
খু‌ড়ির নাম‌টি খু‌ড়ি হওয়ার পেছ‌নে একটা কাহি‌নী র‌য়ে‌ছে। ওর একটা ভা‌লো নাম আ‌ছে। রা‌বেয়া খাতুন, কিন্তু অ‌নে‌কে হয়ত নামটা জা‌নেও না। ও যখন অ‌নেক ছোট তখন ওর মা উঠা‌নে খেজু‌রের রস জ্বাল দি‌চ্ছি‌লো। গ্রা‌মের বাচ্চারা গুড় খাবার জন্য সাধারণত র‌সের চুলার পা‌শে অ‌পেক্ষা  ক‌রত। খু‌ড়ি আর ওর ভাই তেমনই অ‌পেক্ষা কর‌ছি‌লো। ওর মা কা‌জের জন্য স‌রে গে‌লে ভাই‌টি ও‌কে র‌সের আগু‌নে ধাক্কা দেয়। জা‌নে বেঁচে    গে‌লেও শরী‌রের অ‌ধিকাংশ অঙ্গ পু‌ড়ে যায়। সে থে‌কে ওর দু‌টি হাত নেই। আর তখন থে‌কেই রা‌বেয়া নাম‌টি বদ‌লে সবাই ও‌কে খু‌ড়ি ব‌লে ডা‌কে। এ‌তে খু‌ড়ির কোন দু:খ নেই। উল্টো আরও ব‌লে, আগু‌নে পু‌ড়ে‌ছি তাতে কি হয়েছে আগুনে পুড়ার আর ভয় নেই।
বি‌য়ে জি‌নিসটা খু‌ড়ির জীব‌নে নেই। বি‌য়ের প্রস্তাব এ‌সে‌ছে অ‌নেকবার কিন্তু কেউ সাহস পায়‌নি দেবার। সবার ধারণা য‌দি বি‌য়ে দি‌লে বাচ্চা জন্ম দি‌য়ে স্বামী চ‌লে যায় ত‌বে কি হ‌বে বাচ্চাটার ? এমন পোড়া চেহারার খোড়া মে‌য়ের সা‌থে কেইবা সংসার কর‌বে। সে নি‌জেও এমনটা ভা‌বে। না‌মে বাবার বাড়ী থাক‌লেও বাবার ভিটায় তার জায়গা হয়‌নি। চাচা‌তো ভাই‌দের বাড়ী কাজ ক‌রে পেট চালায় সে। য‌দিও পুরো বংশ টা‌কে সে নি‌জের বাড়ি ম‌নে ক‌রে, তারপরও সবাই তা‌কে কা‌জের বি‌নিম‌য়ে ভাত দেয়।
বাচ্চা‌দের খু‌ড়ি খুব বে‌শি ভা‌লোবা‌সে আর বাচ্চারাও ওর জন্য পাগল। এ পর্যন্ত অ‌নেকগু‌লো বাচ্চা তার কা‌ছে বড় হ‌য়ে‌ছে। চাচা‌তো ভাই‌দের বাচ্চাগু‌লো‌কে সেই কো‌লে পি‌ঠে ক‌রে বড় ক‌রেছে। এ‌দের অ‌ধিকাংশই লেখাপড়া শি‌খে অ‌নেক বড় হ‌য়ে‌ছে। বি‌য়ে ক‌রে সংসার পে‌তেছে। কিন্তু মা‌য়ের মত যে অসহায় ম‌হিলা‌টি তা‌দের ভা‌লো‌বে‌সে‌ছে তার খোঁজ কেউ রা‌খেনা। তবুও এখনও সে প‌রের সন্তান‌কে ভা‌লোবা‌সে। হয়ত প‌রের সন্তা‌নের মা‌ঝে নি‌জের সন্তা‌নের সুখ খুঁ‌জে পায়।
খু‌ড়ির জীব‌নে একবার প্রেম এ‌সে‌ছি‌লো। খু‌ড়ি ভা‌লো বং‌শের মে‌য়ে। তা‌দের বাড়ীর পা‌শেই কা‌রিগর‌দের বাস। সম্প‌র্কে প্র‌তি‌বে‌শি এক কা‌রিগর বড় ভাই তা‌কে বি‌য়ে কর‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লো। এ‌তে সেও রাজী ছি‌লো। কিন্তু ছোট বং‌শে বি‌য়ে দি‌লে তা‌দের বং‌শের মানহানি হ‌বে ব‌লে বং‌শের লোকজন বি‌য়ে‌টি হ‌তে দেয়‌নি। খাবার না পে‌য়ে না খে‌য়ে মর‌লেও হয়‌তো দেখার লোক নেই কিন্তু ছোট বং‌শে বি‌য়ে হ‌লে জাত যা‌বে ব‌লে সবাই বি‌য়ে‌তে বাঁধা দেয়।
খু‌ড়ির কা‌ছে সবসময় একটা ক‌রে বাচ্চা থা‌কে। কিন্তু ইদা‌নিং বাচ্চার মায়েরা বাচ্চা দি‌তে চায়না খু‌ড়ির কা‌ছে। কারণ ওর তো হাত নেই কেউ য‌দি কে‌ড়ে নি‌য়ে যায় বাচ্চা। অ‌নেক বাচ্চা‌কেই খু‌ড়ি নি‌জের সন্তা‌নের মত বড় ক‌রে‌ছে কিন্তু বড় হ‌য়ে তারাই ফুপু ব‌লে খু‌ড়ির প‌রিচয় দি‌তে লজ্জা পায়।কোন এক রো‌দেলা দুপু‌রে, বাড়ী থে‌কে একটু দু‌রে পুকুর পা‌ড়ে ব‌সে জীব‌নের পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মিলা‌তে চেষ্টা কর‌ছে খু‌ড়ি। কিন্তু হিসা‌বে এত বে‌শি ফারাক যে নি‌জে‌কেই বুঝা‌তে পার‌ছেনা সে। কি আ‌ছে আর কি ছি‌লো এমনটা ভাবতে ভাবতে সারাটা জীবনই তার শূন্য হয়ে রইলো। কোন দিন কিছু ছি‌লোনা আর হ‌বেওনা। শুধু প্রকৃ‌তির কা‌ছে একটাই প্রশ্ন, তার জীবন শে‌ষে তার জন্য কাঁদার একজনও কি মানুষ থাক‌বে এ পৃ‌থিবীতে ?
রওনুক নূর : লেখিকা- শিক্ষিকা ।

Leave a Reply