ফরিদপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, ২৬ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ॥VOICE OF FARIDPUR

ভয়েস অব ফরিদপুর নিউজ ॥
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরিদপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। বন্যার পানিতে পড়ে মারা গেছে একটি শিশু। বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বর্তমানে বিপদসীমার ৬৬ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গোয়ালন্দ পয়েন্টের গেজ রিডার ইদ্রিস আলী জানান, গত ২৪ ঘন্টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি আরও ২ সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে রবিবার সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার (৮ দশমিক ৬৫) ৬৮ সে. মি (৯ দশমিক ৩৩) উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে বন্যার পানিতে পড়ে মারা গেছে দুই বছরের শিশু তাকিয়া আক্তার। গত শনিবার সন্ধ্য ৭টার দিকে তার মৃতদেহ বাড়ির সামনে উঠনে বন্যার পানিতে ভাসতে দেখা যায়। তাকিয়া উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের ছমির ব্যাপরির ডাঙ্গী গ্রামের কামাল খানের মেয়ে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তাকিয়া ছোট।
তাকিয়ার মা সীমা বেগম জানান, বিকেলে দিকে তিনি তার মেয়েকে ঘরের বিছানায় ঘুম পড়িয়ে রেখে বাড়ির নিত্য প্রয়োজনীয় সাংসারিক কাজ করছিলেন। সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি বাড়ির ডোয়ায় (দরজা সংলগ্ন উঠোন) বন্যার পানিতে তাকিয়াকে মৃত অবস্থায় ভাসতে দেখেন।
চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান আমির খাঁ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সবার অলক্ষে বাড়ির উঠনে বন্যার পানি পড়ে মারা গেছে দুই বছরের মেয়ে তাকিয়া।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ফরিদপুরের বন্যা কবলিত তিনটি উপজেলার ২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান রবিবার থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর সদর ও চরভদ্রাসনে সাতটি করে ১৪টি এবং সদরপুরে ১২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া সদরপুরে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার পদ্মা আড়িয়াল নদে সাম্প্রতিক সময়ে পানি বৃদ্ধি থাকায় তিনটি চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পাচ হাজার পরিবার। নদের পানি ঘরে উঠায় চরম বিপাকে রয়েছে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে খেটে খাওয়া হতদরিদ্ররা। চরনাছিরপুর ইউনিয়নের মোল্যা কান্দি গ্রামের লোকজন টংঘর তুলে বসবাস করছে । বিশুদ্ধ পানির অভাবও রয়েছে তাদের। পানি আনতে সাঁতরে যেতে হয় প্রায় দুশ মিটার দুরে। গবাদি পশুর গোখাদ্য ও সংকট রয়েছে। এমনি ভাবে শত শত পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছেন পানিবন্দি হয়ে।
পদ্মা আড়িয়াল নদীতে ভাঙন অব্যাহত হয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়ে শতাধিক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। পানিবৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতিনিয়ত প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম।
উপজেলার চরনাছিরপুর,দিয়ারা নারিকেল বাড়িয়া,ঢেউখালী ও চরমানাইর চারটি ইউনিয়নে প্রায় পাচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদের পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় তিন হাজার বিঘা ফসলি জমি। বিভিন্ন এলাকার রোপা আমন ধানের বীজতলা ও সবজি পানিতে নিমজ্জিত এবং কাঁচা ঘর, সেতু ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বেশ কিছু পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূরবী গোলদার বলেন, বর্ন্যায় প্লাবিত পানিবন্দি পরিবারের খোজ খবর নেওয়া হচ্ছে। এবং ত্রান দেওয়া হচ্ছে। ত্রান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। প্রশাসন সর্বদা তাদের পাশে রয়েছে।
চরনাছিরপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ মোঃ আক্কাছ আলী জানান, ওই ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিতদের মাঝে সরকারি ত্রান বিতরন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে চরবাসী মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
দিয়ারা নারিকেল বাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ নাসির উদ্দীন সরদার বলেন, ওই ইউনিয়নের ২২টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দিদের মাঝে শুকনা খাবার ও সরকারি ত্রান বিতরণ করা হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে দুই হাজার পরিবার। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা ও আশ্রয়ন কেন্দ্র না থাকার কারনে বানভাসি মানুষের প্রচুর সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু এহসান মিয়া জানান, বন্যায় পানিবন্দি ও ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে তাদের মাঝে সরকারি ত্রান পৌছে দেওয়া হচ্ছে।
ফরিদপুর সদরের ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মো. মেহেদী হাসান মিন্টু জানান, ওই ইউনিয়নের ৯০ভাগ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। তিনি জানান, ইউনিয়নের চার হাজার পরিবারের অন্তত ১০হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে জীবনযাপন করছে। তিনি বলেন, পানির কারণে জমির ধানসহ সব ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মানুষ বাইরে যেতে না পারায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে, ফলে পানিবন্দিরা মানবেতর জীবন যাপন করছে।
রোববার ডিক্রিরচর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের এক হাজার পরিবারের মধ্যে সরকারের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচীর প্রকল্পের আওতায় পরিবার প্রতি ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। সকাল থেকে ট্রলারে করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে এসব চাল বিতরণ করা হয়।

Leave a Reply