রাজধানীর চকবাজারে আগুন: ॥হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ৮১ জনে॥ VOICE OF FARIDPUR NEWS

ভয়েস অব ফরিদপুর নিউজ ॥
রাজধানীর চকবাজারে আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৮১ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের সামনের কয়েকটি ভবনে আগুন লাগার পর থেকে শতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গে ভিড় করছেন তাদের স্বজনরা। খুঁজতে আসা কেউ কেউ স্বজনকে আহত অবস্থায় পেয়েছেন, আবার কেউ মর্গে পেয়েছেন মরদেহ। মর্গের সামনে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে পড়েছে হাসপাতালের পরিবেশ।
ঢামেক মর্গে বা জরুরি বিভাগে গিয়েও অনেক নিখোঁজের সন্ধান পাওয়া যায়নি। জরুরি বিভাগ ও মর্গে যাদের পাওয়া যায়নি, তাদের সম্ভাব্য অন্যান্য জায়গায় খোঁজা হচ্ছে। এদিকে, অনেক নিহতের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ঢামেক কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ৮১ জনে।
বুধবার মধ্যরাত থেকে চাচা কাজী এনামুল হক অভির খোঁজে একাধিকবার ঢামেক হাসপাতাল মর্গে ও জরুরি বিভাগে এসেছেন কাজী জহির। তিনি জানান, তার চাচা সিটি কলেজ থেকে বিবিএ পাস করে রূপালী লাইফ ইনসুরেন্সে চাকরি করছিলেন। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগুনের ঘটনায় কোনও ক্ষতি হয়েছে কিনা এ আশঙ্কা থেকে তিনি ঢামেকে খোঁজ করছেন।
রাতে কয়েক দফা ঢামেকে খোঁজ করার পর বৃহস্পতিবার সকালে আবার এসেছেন বড়কাটারা মাদ্রাসার ছাত্র মো. আতাউর। তিনি জানান, তার শিক্ষক মাওলানা ওমর ফারুকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আগুনে পুড়ে যাওয়া ওয়াহিদ মঞ্জিলে মাওলানা ফারুকের একটি ফার্মেসি ছিল।
সকাল থেকে মেডিক্যালের মর্গের সামনে অবস্থান করছেন নিহত মজিব হাওলাদারের ভাই মামুন। তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে ভাইকে খুঁজে পাচ্ছি না। এরপর এখানে এসে যেসব লাশ দেখতে পেয়েছি তাতে এখনও নিশ্চিত হতে পারছি না আমার ভাই কোনজন।

স্বজনের খোঁজে মোবাশ্বর হোসেন এসেছেন ঢামেকের মর্গে। তিনি জানান, তার বাবা হাজি মো. ইসমাইলকে পাওয়া যাচ্ছে না। রাতে ঘটনার পূর্ব মুহূর্তে তাদের বাসার নিচের একটি দোকান থেকে চা খেয়ে হাঁটতে বের হন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মর্গের লাশগুলো এক এক করে দেখেছেন। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছেন না।
চকবাজারের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়েছেন পিন্টু। ভোর রাত থেকেই মর্গের সামনে স্বজনদের নিয়ে অবস্থান করছেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, তাদের স্বজনের লাশ শনাক্ত করতে পেরেছেন। এখন কর্তৃপক্ষ হস্তান্তর করলেই লাশ বাড়িতে নিয়ে যাবেন।
ঘটনাস্থল সংলগ্ন হাজি বান্নু রোডে থাকতেন নোয়াখালীর শাহীন (৪৫)। বিভিন্ন পণ্যের ব্রোকার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাকেও গতকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার সন্ধানে ঢামেক মর্গে এসেছেন স্ত্রীর বড় ভাই আকতার হোসেন।বিভিন্ন স্থানে খুঁজে না পেয়ে ঢামেকে পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন তিনি।
নিহত অনেকের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ। তিনি বলেন, যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন, তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল মর্গে পাঠানো হচ্ছে। অনেকের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এছাড়া কারও কারও চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। ফলে তাদের পরিচয় পেতে সময় লাগবে।
সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দিয়ে দেখা গেছে, নিহতদের স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে আছে পরিবেশ। কিন্তু মর্গে যেসব লাশ রয়েছে সেগুলো শনাক্ত করা যাচ্ছে না। লাশগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। তবে স্বজনদের কেউ কেউ আকার আকৃতি ও বিভিন্ন চিহ্ন দেখে লাশ শনাক্তের দাবি করছেন। কোনও সান্ত¡নাতেই তাদের কান্না থামানো যাচ্ছে না।
ভাইয়ের সন্ধানে গভীর রাত থেকে মর্গে অবস্থান করছেন অ্যাডভোকেট সুমাইয়া আক্তার। কান্না করতে করতে তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের হাত ভেঙে গিয়েছিল। তার হাতের ভেতর অপারেশন করে রড দেওয়া হয়েছে। শরীর পুড়ে গেলেও হাতের রড ও কোমরের বেল্ট দেখে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।
দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, এখন পর্যন্ত কোনও লাশ আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে তারা নির্ধারিত ব্যাগ রেখে নাম্বারিং করে মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছেন। সেখানে লাশ শনাক্তের সব প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
রাজধানীর চকবাজারের নন্দ কুমার দত্ত রোডের কয়েকটি ভবনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মরদেহ শনাক্ত করে হস্তান্তর শুরু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহ হস্তান্তর করা হচ্ছে। তবে মরদেহ বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের।
বৃহস্পতিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টার পর থেকে শুরু হয়েছে এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া। তবে শনাক্ত করা মরদেহগুলোর হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে আহাজারিরত স্বজনদের।
দুপুর ১টার সময় মো. বাবুল তার ভগ্নিপতি কামাল হোসেনের মরদেহ বুঝে পেয়েছেন। কিন্তু হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ করতে লাগছে দীর্ঘ সময়। আর অপেক্ষারত স্বজনদের আহাজারিতে যেন কেঁপে উঠছে ঢামেক হাসপাতালের প্রতিটি কণা।

মো. বাবুল বলেন, মরদেহ হাতে পেয়েছি এবং তারা যেসব তথ্য চেয়েছে সবকিছু দিয়েছি। এমনকি প্রমাণিত হয়েছে এটা আমার আত্মীয়র মরদেহ। তবুও তারা কি কাজ করছে জানি না, বলছে টাকা পয়সা দেবে। এসব করতে নাকি দেরি হচ্ছে। আমাকে দ্রুত মরদেহ বুঝিয়ে দিলেই আমার সুবিধা হয়। কারণ আমার বোন ইতোমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তার দেখভাল করতে হবে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০ হাজার করে টাকা নিহতের পরিবারের সঙ্গে দিয়ে দেওয়ার ঘোষণা এর আগেই দেওয়া হয়েছে। তবে এই টাকার খবর জানেন না মরদেহ গ্রহণকারী স্বজনদের অনেকে। টাকা নিতে আগ্রহীও নন তারা।
রফিকুল ইসলাম শনাক্ত করতে পেরেছেন তার ভাইয়ের মরদেহ। কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া রফিকুল ইসলামের স্বাক্ষর ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করবে না। কিন্তু সেখানে রোগীর অন্যান্য স্বজনরা উপস্থিত রয়েছেন। রফিকুল ইসলামের নাম শুরুতে লেখা হয়েছিল বলেই তার স্বাক্ষর দিয়েই নিয়ম অনুসারে মরদেহ নিতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে রফিকুলের আরেক স্বজন জানান, প্রথমত রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মৃত্যু হয়েছে। এই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে না উঠতে এখন মরদেহ নিতে আবার স্বাক্ষরের সমস্যা দেখা দিয়েছে। যার স্বাক্ষর দেওয়ার কথা সে বার বার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তাকে আনতেও পারছি না।
আবার ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে এমন কোনো ঘোষণার কথা তারা জানেনই না। এ বিষয়ে ওই স্বজন বলেন, টাকার ব্যাপারে আমাদের কোনো দাবি নেই। দ্রুত মরদেহ দিয়ে দিলেই হবে।
এদিকে কর্তব্যরত পুলিশদের সূত্রে জানা গেছে, সরকারি যে নির্দেশনা দেওয়া আছে সে অনুসারেই আমরা কাজ করছি। নিয়ম বহির্ভূত কোনো কাজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমরাও চেষ্টা করছি দ্রুত মরদেহ হস্তান্তর করতে।
স্থানীয়রা বলছেন, চকবাজারের নন্দকুমার দত্ত রোডের শেষ মাথায় চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশে ৬৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওয়াহিদ ম্যানশনে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। আবাসিক ভবনটিতে কেমিক্যাল গোডাউন থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

Leave a Reply